দুর্যোগ কাকে বলে,বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ

দুর্যোগ কাকে বলে? | বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ

দুর্যোগ কাকে বলে: আজকে আমরা জানবো দুর্যোগ কাকে বলে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের এই পোস্টটি সম্পূর্ণ পড়ুন। আশা করি আপনারা এই প্রশ্নের উত্তর ভালো ভাবে বুঝতে পারবেন।

দুর্যোগ কাকে বলে,বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ
দুর্যোগ কাকে বলে

দুর্যোগ কাকে বলে?

প্রাকৃতিক কারণে যে সকল দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে। এ ধরনের দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, তুষারপাত ইত্যাদি।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ

পৃথিবীর প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এদেশের ভৌগলিক অবস্থান, জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রভৃতি কারণে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। ক্ষয়ক্ষতি হয় সম্পদ ও জীবনের। বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী ঝড় ও টর্নেডো, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা, আর্সেনিক, ভূমিকম্প ও সুনামি প্রভৃতি।

নিম্নে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো:

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস

ঘূর্ণিঝড়ের ইংরেজি প্রতিশ্বদ Cyclone। এটি গ্রিক শব্দ Kyklos থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। যার অর্থ কুণ্ডলি পাকানো সাপ। ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস কুণ্ডলি পাকানো সাপের আকার ধারণ করে বলে এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানী হেনরি পিডিংটন ১৮৪৮ সালে প্রথম এ শব্দটি ব্যবহার করেন। সাধারণত এপ্রিল – মে এবং অক্টোবর – ডিসেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির একটি আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির একটি আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সমূহের মধ্যে কোনো কোনোটি মারাত্মক ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সমুদ্র পৃষ্ঠে সাধারণত ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রস্থলে নিম্নচাপ এবং চারপাশে উচ্চচাপ বিরাজ করে। এসময় উচ্চচাপযুক্ত বায়ু প্রবলবেগে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রভাগে যেখানে নিম্নচাপ থাকে সেদিকে ধাবিত হয়। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়। এটি উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠে উৎপত্তি লাভ করে মহাদেশীয় মূলভাগের দিকে অগ্রসর হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রস্থলকে চোখ বলে। এটি দেখতে অনেকটা মানুষের চোখের মতো। বিগত অর্ধশতাব্দীতে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানে। এর মধ্যে ১৯৭০, ১৯৮৮, ১৯৯১, ২০০৭, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় অন্যতম। জীবনহানির দিকে থেকে সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ১৯৭০ এব্ং ১৯৯১ সালে সংঘটিত হয়। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৫ লক্ষাধিক, ১৯৯১ সালে ১.৪০ লক্ষ, ২০০৭ সালে ১০ হাজার এবং ২০০৯ সালে ৭ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় জেলাসমূহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা প্রভৃতি।

ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত জলোচ্ছ্বাস। ঘূর্ণিঝড় উৎপত্তির পর যখন প্রবলবেগে স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হয় তখন সমুদ্রের জলরাশি ফুলে ওঠে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মূল ভূ-খণ্ডে আঘাত হানে। এরূপ উঁচু জলরাশিকে জলোচ্ছ্বাস বলে।

এসময় জলরাশির উচ্চতা ১৫-৪০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় যদি অমাবস্যা বা পূর্ণিমা থাকে তাহলে পানি আরো বেশি ফুলে ওঠে এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভোলায় প্রায় ৪০ ফুট, ২০০৭ সালে পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে প্রায় ২০ – ২৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও ভূমিকম্পের ফলেও জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। (দুর্যোগ কাকে বলে)

ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে সুনামি বলে। জলোচ্ছ্বাসের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মানুষসহ জীবজন্তু ও সহায় সম্পদ পানিতে ভেসে চলে যায় এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চল সমুদ্রের সাথে মিশে যায়। যেমন – ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে পরবর্তীতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বহুমুখী পদক্ষেপ ২০০৭ এবং ২০০৯ সালে যথাক্রমে সিডর ও আইলায় জীবনহানির পরিমাণ সহনীয় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কালবৈশাখী ঝড় ও টর্নেডো

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে কালবৈশাখী ঝড় এবং টর্নোডো অন্যতম। কালবৈশাখী ঝড় গ্রীষ্মকালীন জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাধারনত বৈশাখ মাসের শেষের দিকে এ ঝড় হতে দেখা যাওয়ায় একে কালবৈশাখী ঝড় বলে। মার্চ – এপ্রিল মাসে সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে বজ্রবিদ্যুৎসহ প্রবল ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়। এর ঝড়ই কালবৈশাখী ঝড় নামে পরিচিত। এ সময় বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের প্রায় এ – পঞ্চমাংশ সংঘটিত হয়। অনেক সময় বৃষ্টিপাতের সাথে শিলাবৃষ্টিও হয়ে থাকে। দেশের পূর্বাঞ্চলে এ ঝড় অধিক হয়ে থাকে। কালবৈশাখী ঝড়ে মানুষ, পশুপাখি ও সম্পদহানি ঘটে, কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

অন্যদিকে, টর্নেডোও একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। টর্নেডো শব্দটি স্পেনিশ Tornada থেকে এসেছে, যার অর্থ বজ্রঝড় বা Thunder Storm। ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় টর্নেডোর ক্ষেত্রেও প্রচন্ডবেগে বাতাস ঘুরতে ঘুরতে প্রবাহিত হয়। কোনো স্থানে নিম্নচাপ বা লঘুচাপ সৃষ্টি হলে উক্ত স্থানের উষ্ণ বাতাস উপরে উঠে যায় এবং ঐ শূন্য জায়গা পূরণের জন্য চতুর্দিকের শীতল বায়ু দ্রুতগতিতে ধাবিত হয় এবং টর্নেডোর উৎপত্তি হয়। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে টর্নেডো আঘাত হানে। ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরয়ায় প্রলয়ংকরী টর্নোডো আঘাত হানে। ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় প্রলয়ংকারী টর্নেডো আঘাত হানে এবং ব্যাপক ধ্বংসলীলা সাধিত হয়। টর্নেডোর ক্ষেত্রে বাতাসের গতিবেগ সাধারণত ঘণ্টায় ৪৮০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার হতে পারে। টর্নেডোর বিস্তার মাত্র কয়েক মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছর টর্নেডো হতে দেখা যায়। টর্নোডো এবং ঘূর্ণিঝড়ের মূল পার্থক্য হলো ঘূর্ণিঝড় উৎপত্তি হয় সমুদ্রে আর টর্নোডো যে কোনো স্থানে সৃষ্টি হতে পারে।

বন্যা, বন্যার প্রভাব

বন্যাঃ সাধারণ অর্থে নদীর পানি যখন দু’কুল ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রাম, নগর, বন্দর, বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ফসল বিনষ্ট করে তখন তাকে বন্যা বলে। অধ্যাপক Chambers এর মতে, Food is a condition of abnormally great flow of water in the river. প্রায় প্রতি বছর দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়।

বন্যার প্রভাবঃ বন্যার ফলে বহুমখী ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। যেমন জীবন ও সম্পদহানি, ফসল উৎপাদন হ্রাস, উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমি লবণাক্ত হওয়া, রোগ-ব্যধির বিস্তার, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়া, সুপেয় পানি সংকট, খাদ্য ও পুষ্টির অভাব প্রভৃতি। বিগত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি ভয়াবহ বন্যা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে ১৯৫৪, ১৯৬৩, ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ১৯৮৮, ২০০৪, ২০০৭ সালের বন্যা অন্যতম। ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং দেশের অধিকাংশ জেলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

নদীভাঙন, নদীভাঙনের কারণ, নদীভাঙনের প্রভাব

নদী ভাঙন (Riverbank Erosion) : সাধারণভাবে নদীর পানি প্রবাহের ফলে নদীর তীর বা পাড়ের ভাঙনকে নদীভাঙন বলে। বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য নদীভাঙন। এ সময় নদীতে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হওয়ার ফলে নদীভাঙন দেখা দেয়। সাধারণত জুন থেকে সেপ্টম্বর মাস পর্যন্ত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অসংখ্য শাখানদী ও উপনদী দ্বারা দেশের প্রায় ১০০টি উপজেলা কমবেশি ভাঙনের শিকার হয়। নদীভাঙনপ্রবণ জেলাসমূহের মধ্যে জামালপুর, কুড়িগ্রাম, মুন্সিগঞ্জ, বগুড়া, মাদারীপুর, নারায়নগঞ্জ, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুর, শেরপুর, রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল, বরিশাল, গোপালগঞ্জ এবং উপকূলীয় অঞ্চল অন্যতম। (দুর্যোগ কাকে বলে)

নদীভাঙনের কারণঃ নদীভাঙন সৃষ্টির জন্য প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও দায়ী।

নদীভাঙনের প্রাকৃতিক কারণসমূহ হলো –

  • বর্ষা মৌসুমে অত্যধিক বৃষ্টিপাত।
  • নদীর গতিপথ অধিক আঁকাবাঁকা হওয়া।
  • পলি জমা হয়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া।
  • বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া।
  • নদীগর্ভে নরম ও ক্ষয়িষ্ণু শিলার উপস্থিতি।
  • নদীগর্ভে ফাটলের উপস্থিতি।
  • পার্বত্য এলাকায় বরফ গলনের মাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি।

নদীভাঙনের মানবসৃষ্ট কারণসমূহ হলো –

  • নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করা।
  • নদী তীরের গাছপালা নিধন করা।
  • নদী তীর এবং তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন।
  • নদী তীর দখল করে নদীর গতিপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা।
  • নিয়মিত নদী খনন না করা।
  • নদীতে বা নদী তীরে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে চাষাবাদ করা।
  • অপরিকল্পিত ও অধিক পরিমাণে নৌযান চালানো ইত্যাদি।
  • নদীভাঙনের প্রভাবঃ নদীভাঙনের ফলে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। অসংখ্য লোক ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুহারা এবং ভূমিহীন হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের অন্যান্য প্রভাবসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উদ্বাস্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্রতা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন হ্রাস, কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস, পুষ্টিহীনতা, শহরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি, রোগ-ব্যধির বিস্তার ইত্যাদি।

লবণাক্ততা, লবণাক্ততার কারণ, লবণাক্ততার প্রভাব

লবণাক্ততাঃ লবণাক্ততা বলতে মাটিও পানিতে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে বুঝায়। সাধারণত লবণাক্ততার মাত্রা পরিমাপ করা হয় Parts Per Thousand বা পিপিটি (PPT) দ্বারা। সমুদ্রের পানিতে লবণাক্তার গড় মাত্রা ৩৫ পিপিট অর্থাৎ ১ কিলোগ্রাম পানিতে প্রায় ৩৫ গ্রাম লবণ থাকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

বঙ্গোপসাগরের পানি জোয়ারের সময় নদীর মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমিতে প্রবেশ করে লবণাক্ততা সৃষ্টি করে। সাধারণত আগস্ট মাস থেকে লবণাক্ততা শুরু হয় এবং ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। উপকূলীয় ১৬টি জেলার ৬৪টি উপজেলায় লবণাক্ততা দেখা যায়। এর মধ্যে সর্বাধিক লবণাক্ততায় আক্রান্ত খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা জেলা। এছাড়া বরিশাল, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, কক্সবাজার, ফেনী জেলা লবণাক্ততায় আক্রান্ত।

লবণাক্ততার কারণঃ সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমিকা পানিতে লবণাক্ততার জন্য জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়। আর সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য মানুষের বহুমুখী কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করা হয়।

লবণাক্ততার প্রভাবঃ লবণাক্ততার ফলে যেসব প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো –

  1. উপকূলীয় অঞ্চলের জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে উৎপাদন হ্রাস পাওয়া;
  2. সুপেয় পানির অভাব দেখা দেওয়া;
  3. উদ্বাস্তু লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি;
  4. সম্পদহানি ও দারিদ্র্যতা বৃদ্ধি;
  5. বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া;
  6. ব্যবসা – বাণিজ্যের ক্ষতি;
  7. মিঠা পানির মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়;
  8. গাছপালায় মড়ক লাগা ও ফসলের গোড়া পচে যাওয়া;
  9. সামাজিক বন্ধনে শিথিল হওয়া প্রভৃতি।

খরা, খরার কারণ, খরার প্রভাব

খরাঃ সাধারণত খরা বলতে কোনো এলাকায় দীর্ঘসময় ধরে ভূমিতে পানির অনুপস্থিতিকে বুঝায়। অর্থাৎ কোনো এলাকা বৃষ্টিহীন অবস্থায় থাকলে বা অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুষ্ক হয়ে পড়ে। এর ফলে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায় এবং পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এরূপ অবস্থাকে খরা বলে।

খরার কারণঃ খরা মূলত প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি মানুষের বহুমুখী কর্মকাণ্ড খরা সৃষ্টিতে সহায়ক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। নিম্নে খরার প্রধান কারণসমূহ উল্লেখ করা হলোঃ

  • সময়মতো বৃষ্টিপাতের অভাব;
  • পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা;
  • অপরিকল্পিতভাবে বনভূমি উজাড়;
  • নদীর উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ;
  • এল নিনো ও লা নিনোর প্রভাব প্রভৃতি।

খরার প্রভাবঃ খরার ফলে যেসব প্রভাব পরিলক্ষিত হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো –

  • কৃষি ফসলের উৎপাদন হ্রাস;
  • ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া;
  • ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অভিগমন;
  • উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্ন হওয়া;
  • খাদ্য ও পুষ্টির সংকট তৈরি হওয়া;
  • গ্রামীন দারিদ্র ও বেকারত্ব বৃদ্ধি;
  • মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস প্রভৃতি।

Also Read: খাদ্য কাকে বলে

আর্সেনিক, আর্সেনিকের প্রভাব

আর্সেনিকঃ আর্সেনিক একটি বিষাক্ত মৌলিক পদার্থ। এটি এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ যা ভূ-গর্ভস্থ পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। আর্সেনিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা হলো ০.০১ পিপিএম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

আর্সেনিকের প্রভাবঃ আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানি ব্যবহার করলে মানবদেহে বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –

  1. চর্ম রোগে আক্রান্ত হওয়া;
  2. জিহ্বা, হাত ও পায়ের তালুতে কালো দাগ;
  3. বমি, অরুচি, রক্ত আমাশয়, মুখে ঘা;
  4. ফুসফুস, জরায়ু, মূত্রনালী, মূত্রথলী ও বৃক্কে ক্ষত তৈরি;
  5. প্রজনন স্বাস্থ্যে প্রভাব;
  6. রক্তশূন্যতা, শ্বসন যন্ত্র আক্রান্ত হওয়া;
  7. স্মৃতি শক্তি হ্রাস;
  8. শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন প্রভৃতি।

ভূমিকম্প, ভূমিকম্পের কারণ, ভূমিকম্পের প্রভাব

ভূমিকম্পঃ বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে ভূমিকম্প সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশকে তিনটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। এগুলো হলো রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ৭ হলে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, মাত্রা ৬ হলে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং মাত্রা ৫ হলে কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গণ্য হবে। দেশের কোন অঞ্চল কোন মাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকির অন্তর্ভূক্ত তা নিম্নে দেখানো হলো –

  1. মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল – দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল এর অন্তর্ভূক্ত।
  2. মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল – দেশের মধ্যাঞ্চল এর অন্তর্ভূক্ত।
  3. কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল – দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল এর অন্তর্ভূক্ত।

ভূমিকম্পের কারণঃ ভূমিকম্পের উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ নিম্নরূপ –

  1. ভূ-ত্বক সাতটি বৃহৎ এবং কতকগুলো ছোট প্লেট দ্বারা গঠিত। এই প্লেটসমূহ একে অপরের দিকে, একে অপরের বিপরীতে অথবা পরস্পর সমান্তরালভাবে সঞ্চালিত হয়। এইরূপ সঞ্চালনের ফলে সৃষ্ট চাপ থেকে আকস্মিকভাবে প্রচন্ড কম্পন সৃষ্টি হয়। ভূ-পৃষ্ঠে এই কম্পন ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে।
  2. কোনো কারণে ভূ-অভ্যন্তরে বড় রকমের শিলাচ্যুতি ঘটলে ভূমিকম্প হয়।
  3. ভূ-আলোড়নের ফলে ভূ-অভ্যন্তরে প্রবল ফ্রিকশান হয়ে কোনো অংশ ধসে পড়ে ভূ-ত্বক কেঁপে ওঠে এবং ভূমিকম্প হয়।
  4. ভূ-গর্ভে সঞ্চিত বাষ্পচাপ অধিক হলে নিম্নভাগে প্রবলভাবে ধাক্কা দেয়, এতে ভূমিকম্প দেখা দিতে পারে।
  5. ভূ-িগর্ভে চাপ হ্রাস পেলে এর অভ্যন্তরস্থ উত্তপ্ত কঠিন পদার্থ গলে নিচের দিকে অপসারিত ও আলোড়িত হতে থাকে, এতে ভূ-ত্বক কেঁপে ওঠে।
  6. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় বহির্মুখী বাষ্পরাশির চাপে ভূমিকম্প হয়।
  7. পার্বত্য অঞ্চলে বড় ধরনের শিলাচ্যুতি বা হিমবাহ অঞ্চলে হিমানী সম্প্রপাত হলে ভূমিকম্প হয়।
  8. খনি অঞ্চলে ভূ-পৃষ্ঠের নিচের কোনো অংশ হঠাৎ ধ্বসে পড়লে ভূমিকম্প। এর ফলে ভূ-পৃষ্ঠে এবং ভূ-অভ্যন্তরে পরিবর্তন দেখা দেয়।
  9. ভূ-গর্ভস্থ আগ্নেয় পদার্থের উর্ধ্বমুখী চাপের ফলে ভূ-কম্পন হয়।
  10. উত্তপ্ত ভূ-অভ্যন্তর তাপ বিকিরণ করে সংকুচিত হলে শিলাস্তরে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য স্থান পরিবর্তন করলে ভূ-ত্বক কেঁপে উঠলে ভূমিকম্প হতে পারে।

ভূমিকম্পের প্রভাবঃ ভূ-ত্বকের আকস্মিক পরিবর্তনকারী প্র্রক্রিয়াসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিকম্প। এর ফলে ভূ-পৃষ্ঠে এবং ভূ-অভ্যন্তরে পরিবর্তন দেখা দেয়।

Also Read: ভেক্টর রাশি কাকে বলে

নিম্নে ভূমিকম্পের মুখ্য প্রভাবসমূহ উল্লেখ করা হলো –

  1. ভূমিকম্পের মাত্রা অধিক হলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে থাকে।
  2. জীবজন্তু ও গাছপালা ধ্বংস হওয়া।
  3. ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, কল-কারখানা ধ্বংসসহ জনজীবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া।
  4. ভূমিকম্পের ফলে ভূ-ত্বকে ফাঁটল, ভাঁজ ও চ্যুতির সৃষ্টি হতে পারে।
  5. নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে।
  6. সমুদ্রতলের পরিবর্তন এবং ভূমির উত্থান ও পতন হতে পারে।
  7. হিমানী সম্প্রপাত হতে পারে।
  8. বহু মানুষ শারীরিক এবং মানসিকভাব প্রতিবন্ধী হতে পারে যা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

তো আজকে আমরা দেখলাম যে দুর্যোগ কাকে বলে এবং আরো অনেক বিস্তারিত বিষয় । যদি পোস্ট ভালো লাগে তাহলে অব্যশয়, আমাদের বাকি পোস্ট গুলো ভিসিট করতে ভুলবেন না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *